শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬

আগামী নির্বাচনে কোন প্রার্থীকে বেছে নেবেন

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তিন পার্বত্য আসনেও চলছে নানা প্রচার-প্রচারণা। অনেকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিশেষ করে শাসনক্ষমতা প্রত্যাশী বড় দলগুলোর প্রার্থীরা সেক্ষেত্রে এগিয়ে। তারা রাস্তাঘাট, পর্যটন... ইত্যাদি হরেক রকম উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। পাহাড়ি জনগণকে এই উন্নয়নের রাজনীতি খুবই ভালোভাবে বুঝতে হবে। শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে গা ভাসিয়ে দিতে নেই।

অপরিকল্পিত ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক উন্নয়ন মানেই পাহাড়ে ভূমি জবরদখল ও পাহাড়ি উচ্ছেদ। তার উদাহরণ আমরা সাজেকে দেখি, বান্দরবানে দেখি। সম্প্রতি রাঙামাটির বিলাইছড়িতেও সেই চেষ্টা চলছে বলে আমরা জানতে পারছি। তাই পাহাড়ে উন্নয়ন দরকার বটে, সেটা এমন উন্নয়ন নয় যেটা পাহাড়িদের নিজ জায়গা-জমি, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে। তাই পাহাড়িদের জন্য উন্নয়নের চেয়েও বেশি দরকার অধিকার, নিরাপত্তা এবং নিজ বসতভিটা ও জায়গা জমিতে শান্তিতে বসবাস করার নিশচয়তা। আর দরকার পাহাড়িদের ওপর চলা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারার মতো সংসদ সদস্য।

ইতিপূর্বে আমরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির শাসনে কাটিয়েছি। এসব দলের হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কয়েকজন পাহাড়ি সংসদ সদস্যকে আমরা পেয়েছি। কিন্তু ফলাফল কী হয়েছে সেটা নিশ্চয় সকলে জানেন। এবারের নির্বাচনে নতুন করে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি ক্ষমতা প্রত্যাশী দলের প্রার্থীও রয়েছেন তিন পার্বত্য আসনে। এ দলগুলোর মধ্যে বিশেষত জামায়াতে ইসলামীর ৭১’র বিতর্কিত ভূমিকা ও তাদের উগ্রবাদী চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে আমরা সকলে নিশ্চয় জানি।

কাজেই, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ভোট দেয়ার সময় পাহাড়ি বাপ-ভাই, মা-বোনেরা নীচে উল্লেখিত কিছু ঘটনার কথা একবার হলেও মনের গভীর থেকে জাগরিত করবেন। যেমন-

১৯৮০ সালে কাউখালীর কলমপতি গণহত্য এবং আশির দশকে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া হামলা-হত্যাকাণ্ডের কথা; ১৯৯২ সালে লোগাং ও মাল্যা গণহত্যা; ১৯৯৩ সালে নান্যাচর গণহত্যা; ২০০৩ সালে মহালছড়িতে পাহাড়িদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটনা-হত্যাকাণ্ড; ২০০৬ সালে মাইসছড়ি হামলার ঘটনা; ২০০৮ সালে সাজেকে পাহাড়িদের ওপর হামলার ঘটনা, ২০১০ সালে সাজেকে দ্বিতীয় বার পাহাড়িদের ওপর হামলার ঘটনা ও খাগড়াছড়ি শহরে পাহাড়িদের ওপর হামলার ঘটনা; ২০১১ সালে লংগদু এবং রামগড়ের (বর্তমানে গুইমারা) শনখোলা পাড়া এলাকায় পাহাড়িদের ওপর হামলার ঘটনা; ২০১২ সালে রাঙামাটি শহরে পাহাড়িদের ওপর হামলার ঘটনা, ২০১৩ সালে তাইন্দংয়ে পাহাড়িদের ওপর হামলার ঘটনা; ২০১৪ সালে বগাছড়িতে পাহাড়িদের ওপর হামলার ঘটনা; ২০১৭ সালে লংগদুতে পাহাড়িদের ওপর হামলার ঘটনা; ২০২৪ সালের দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি সদর ও রাঙামাটি সদরে পাহাড়িদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা-হত্যার ঘটনা; ২০২৫ সালের গুইমারা রামেসু বাজারে পাহাড়িদের ওপর হামলা-হত্যাকাণ্ড এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ভূমি বিরোধের জেরে সেটলারদের হামলায় নিহত হওয়া বিমল ত্রিপুরার কথা।

এসব ঘটনার কথা মনে করলে আপনি নিশ্চয় নিজের বিবেকবোধকে জাগ্রত করতে পারবেন। নিজের ভোট কাকে দেবেন সেটা বিবেচনা করতে পারবেন। কোন প্রার্থী এসব ঘটনাবলী সংসদে তুলে ধরতে পারবেন সেটা বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারবেন।

মনের মধ্যে আরও জাগরিত করবেন বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরবর্তী দীর্ঘ ৫৪ বছরের অধিক সময় ধরে পাহাড়ে চলমান সেনাশাসন ও অন্যায়-অবিচারের কথা।

এটাও মনে মনে ভাববেন যে, কথিত জাতীয় দলের ( বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দল) প্রার্থীরা (সে পাহাড়ি কিংবা বাঙালি হোক) কখনো উপরিউক্ত ঘটনাবলীর বিচার চেয়ে এবং পাহাড়িদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের কথা সংসদে তুলে ধরবেন না। তারা সেনাশাসন তুলে নেয়ার কথা বলবেন না, বরং সেনা শাসন জোরদার করার কথা বলবেন। তারা শুধু নিজেদের ও দলীয় স্বার্থের কথা ভাববেন। উন্নয়নের নামে পাহাড়িদের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন চালাবেন।

কাজেই, পাহাড়ি বাপ-ভাই, মা-বোনদের প্রতি আহ্বান- আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খুবই ভেবেচিন্তে আপনার মূল্যবান ভোটটি প্রয়োগ করুন। তবে অবশ্যই জাতীয় দলভুক্ত প্রার্থী (সে পাহাড়ি কিংবা বাঙালি) ব্যতীত জনগণের পক্ষের প্রার্থীকেই বেছে নেবেন।

নিরন চাকমা

৩১.০১.২০২৬

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন