বুধবার, ১২ জুন, ২০১৩

কল্পনা চাকমার সন্ধান দিতে সরকারের এত অনীহা কেন?

আজ ১২ জুন কল্পনা চাকমা অপহরণের ১৭ বছর পূর্ণ হল।  ১৯৯৬ সালের এই দিনে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়িতে কজইছড়ি সেনা ক্যাম্পের কমান্ডার লে. ফেরদৌস কর্তৃক কল্পনা চাকমা অপহৃত হয়েছিলো। কিন্তু রাষ্ট্র তথা সরকার আজো কল্পনা চাকমার কোন হদিস দিতে পারেনি।

কল্পনা ছিলো রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক প্রতিবাদী কন্ঠ। ভয়-ভীতি, হুমকী, প্রলোভন দেখিয়ে নিপীড়ক সেনা কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠি তাকে কখনই জব্দ করতে সক্ষম হয়নি। স্বভাবতই কল্পনা ছিলো কায়েমী স্বার্থবাদী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠির নিকট আতঙ্কের কারণ। তার সাথে রাজনৈতিক যুক্তি-বিশ্লেষণ ও অন্য কোন কিছুতে কুলিয়ে উঠতে না পেরে, সেনা কায়েমী স্বার্থবাদী চক্রটি এক ঘৃণ্য ন্যাক্কারজনক পন্থা অবলম্বন করে। সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত অবস্থায়, কল্পনা নিজ বাড়ীতে লে. ফেরদৌসের নেতৃত্বে নিরাপত্তা বাহিনীর কতিপয় সদস্য দ্বারা অত্যন্ত কাপুরুষোচিতভাবে অপহরণের শিকার হয়।

কল্পনা চাকমা যখন অপহৃত হয় তখন দেশে ক্ষমতায় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের মাত্র ৭ ঘন্টা আগেই সে অপহরণের শিকার। কল্পনা চাকমার মতো একজন নারীকে নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

অপহৃত কল্পনাকে উদ্ধার, তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ এবং চিহ্নিত অপহরণকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবার দাবিতে সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠে গণতান্ত্রিক চেতনা সম্পন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ। দেশের বাইরেও কল্পনা অপহরণ ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে চিঠি দেয়।

অপরদিকে, অপরাধ ধামাচাপা দিতে দেশের গোটা সেনাবাহিনী তপর হয়ে উঠে। সামরিক হেলিকপ্টারে রাঙ্গামাটি সহ বেশ কিছু এলাকায় কল্পনা চাকমার সন্ধান চেয়ে লিফলেট বিলি, সন্ধান দাতার জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরষ্কার ঘোষণা, সেনা সদরের আইএসপিআর থেকে বিবৃতি প্রকাশ, সাইনবোর্ড সর্বস্ব একটি মানবাধিকার সংস্থাকে দিয়ে ত্রিপুরার গন্ডাছড়া গ্রামে কল্পনা চাকমার সন্ধান লাভ এবং সংবাদ সম্মেলনে তা প্রকাশ, খোদ তকালীন সেনা প্রধান লেঃ জেনারেল মাহবুব কর্তৃক ঘটনাকে “হৃদয়ঘটিত” বলে মিথ্যা বিবৃতি দান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যতম সদস্য প্রফেসর ইউনুস কর্তৃক সেনা প্রধানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বিবৃতিদান... ইত্যাদির মাধ্যমে ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আজো এ চক্রটি কল্পনা চাকমাকে নিয়ে এ ধরনের মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

তারপরও দেশ-বিদেশের ব্যাপক জনমত ও আন্দোলনের চাপে পড়ে সরকার ঘটনা তদন্তে ১৯৯৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আব্দুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজো প্রকাশ করা হয়নি।

এরপর ২০১০ সালের ২১ মে বাঘাইছড়ি থানার এস আই ফারুক আহম্মদ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন। এতে তিনি কল্পনা চাকমার সন্ধান পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে মামলাটি বাতিল করার আবেদন জানান। এর বিরুদ্ধে মামলার বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা না-রাজি আবেদন জানান।

বিচারক সিআইডির মাধ্যমে পুনর্বার তদন্তের নির্দেশ দিলে সিআইডি কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল্লাহ ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করেন। কিন্তু উক্ত তদন্ত রিপোর্টেও প্রকৃত দোষীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি বরং উক্ত তদন্ত রিপোর্টে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে কল্পনা অপহরনের সাথে জড়িতদের রক্ষার চেষ্টা করা হয়।

সর্বশেষ সিআইডির দাখিল করা এ রিপোর্টের উপর দু’দফা শুনানী শেষে এ বছর অর্থাত ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারী রাঙামাটি মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত আবারো পুলিশ সুপারকে দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। যা কোনভাবেই গ্রহণ যোগ্য হতে পারে না।

হিল উইমেন্স ফেডারেশন সহ বিভিন্ন সংগঠন আদালতের এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করে কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার সঠিক তথ্য অনুসন্ধানের জন্য নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন ও চিহ্নিত অপহরণকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। কিন্তু সরকার এখনো বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেনি।

কল্পনা অপহরণের প্রতিবাদে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে এমনকি দেশের বাইরেও এত বিক্ষোভ আন্দোলন, রূপনের মতো স্কুল ছাত্রের আত্মবলিদান, সমর-সুকেশ ও মনোতোষের গুম হওয়া এবং এত লেখালেখি, এত প্রতিবাদ, নিন্দার ঝড় সত্ত্বেও রাষ্ট্র আজ পর্যন্ত কল্পনা চাকমার সন্ধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

মূলত এ রাষ্ট্র, সরকার এবং এ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী, নিরাপত্তা ব্যবস্থা-- দেশের সংখ্যালঘু জাতি, সমাজের প্রান্তিক-দুর্বল-অনগ্রসর-পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠি এবং নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তো দূরে থাক, উল্টো নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় হুমকী হয়ে দাঁড়ায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং দেশের অন্যান্য জায়গায় সংঘটিত এ যাবতকালের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করলে এর প্রমাণ মেলে।

সরকার তথা রাষ্ট্রের অনীহার কারণেই আজ ১৭ বছরেও কল্পনা চাকমার কোন সন্ধান মিলেনি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কল্পনা চাকমার সন্ধান দিতে এ দেশের সরকারের এত লুকোচুরি, এত অনীহা কেন? পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ ও দেশবাসীর কাছে সরকারকে এর যথাযথ জবাব দিতেই হবে।


রবিবার, ৫ মে, ২০১৩

আজ লংগদু গণহত্যার দুই যুগ

আজ ৪মে ২০১৩ লংগদু গণহত্যার দুইযুগ পূর্ণ হলো। ১৯৮৯ সালের এই দিনে রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় আর্মি ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর(ভিডিপি) সহায়তায় সেটলাররা পাহাড়ি অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করে এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ মুর্তি ধ্বংস করে। সেটলারদের এহামলায় বহু পাহাড়ি হতাহত হয়।

সময়ে এ হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়, প্রাক্তন সংসদ সদস্য চাইথোয়াই রোয়াজা, প্রাক্তন সংসদ সদস্যা সুদীপ্তা দেওয়ান ,প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টা সুবিমল দেওয়ান, তকালীন রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ান এবং রাঙামাটি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মায়াধন চাকমাসহ ২২ জন বিশিষ্ট পাহাড়ি নেতা বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন।

স্মারকলিপিতে তারা এ হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “উপজেলা সদরেসব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য, লংগদু ইউনিয়নপরিষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান  ও ৩নং লংগদু মৌজারহেডম্যান অনিল বিহারী চাকমা তার বাসভবনে হামলার শিকার হন। ভাগ্যক্রমে তিনি প্রাণে বেঁচেগেলেও তার স্ত্রী ও প্রতিবেশীদের অনেকে(যারা হেডম্যানের বাসভবনে আশ্রয় নিয়েছিল) এইনির্মম হত্যার শিকার হয়েছেন। হত্যাকারীরা দা, বল্লম ইত্যাদি সহ আগ্নেয়াস্ত্রের দ্বারাগুলি করে এইসব নিরীহ নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে হত্যা করেও ক্ষান্ত হয়নি। মৃতদেহগুলিবাড়ীতে ফেলে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। অনিল বিহারী চাকমা তার স্ত্রীর মৃতদেহবাড়ী থেকে বের করে বাড়ীর পাশ্ববর্তী জঙ্গলে সারারাত পাহারা দিয়ে রাখেন। ভোরের দিকেথানায় খবর দিতে এসে উদ্ধার করতে গেলে পরবর্তীতে মৃতদেহের কোন হদিস পাননি। পরিস্থিতিরএমন ভয়াবহতায় মৃতদেহগুলি ধর্মীয় বিধিতে পর্যন্ত সকার করা সম্ভব হয়নি। ” ((তথ্য সূত্র: রাডার, লোগাঙগণহত্যা সংখ্যা)।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি- এ বর্বর হত্যাযজ্ঞের সংবাদ সে সময় বাংলাদেশের কোন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। 

এই  হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর পার্বত্যচট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের অভ্যুদয় ঘটে।  লোমহর্ষক এ গণহত্যার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানোর জন্য ঢাকার রাজপথে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ১৯৮৯ সালের ২১শে মে মৌন মিছিল সহকারে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ এ বর্বরতমহত্যাযজ্ঞের তীব্র নিন্দা এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি প্রদানসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ দাবি করে। 

কিন্তুদীর্ঘ দুই যুগ অতিক্রান্ত হলেও কোন সরকারই এ হত্যাযজ্ঞে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।   লংগদু গণহত্যাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে এ যাব ডজনের অধিক গণহত্যা সংঘটিত হলেও কোন ঘটনারই সঠিক তদন্ত রিপোর্ট আজ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।   

আজ এইহত্যাযজ্ঞের দুই যুগের দিনে সকলের  প্রতি আহ্বানজানাই, আসুন পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবতা বিরোধী এসব হত্যাযজ্ঞে জড়িতদের বিচারের  আওতায় নিয়ে এসে  দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোচ্চাই হই।  

শেষে তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- ‘হে শৃংখলিত তারুণ্য, কোন সরু পথ খোলা নেই তোমার সম্মুখে।  বিক্ষুব্ধ জনতার ভীড়ে নিরুপায় প্রজন্মকে প্রতিবাদী হতেই হবে। জড়াগ্রস্ত নেতৃত্বের সুবিধাবাদী চরিত্রের চোয়াল ভাঙো। বিকলাঙ্গ রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার গালে প্রতিবাদের আচড় বসাতেই হবে। নচেৎ অর্থহীন এ তারুণ্য। একই সাথে বিকৃত ও ধিকৃত সেই যৌবনও।”

বৃহস্পতিবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৩

লোগাং গণহত্যা স্মরণে

আজ ১০ এপ্রিল ২০১৩ সাল। লোগাং গণহত্যার ২১ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৯২ সালের এদিন খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার লোগাং গুচ্ছগ্রামে সেনা-সেটলাররা পার্বত্য চট্টগামে স্মরণকালের বর্বরতম গণহত্যা চালায়। এ গণহত্যায় কয়েকশ পাহাড়ি হতাহত হয়। শত শত ঘরবাড়িপুড়ে ছাই হয়ে যায়। আজকের এই দিনে এ হত্যাকাণ্ডে নিহতদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

১০ এপ্রিল ১৯৯২। দুপুরবেলায় হঠা শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ। সেনা-বিডিআর, গ্রাম প্রতিরক্ষাবাহিনী ও সেটলাররা পাহাড়িদের গুচ্ছগ্রামের উপর একযোগে হামলা চালায়। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী(?)দল সেদিন বন্দুক দিয়ে আর সেটলাররা দা, কুড়াল, কিরিচ ইত্যাদি দিয়ে দুই ঘন্টার মত হত্যাযজ্ঞচালায়। পাহাড়িদের বাড়ির ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। আর যারা বাইরে ছিলএবং দৌঁড়িয়ে পালাবার চেষ্টা করেছিল তাদের গুলি করা হয়। গ্রামের সব বাড়ি পুড়ে ছাই করে দেয়া হয়। আজকের এই দিনে এ হত্যাকাণ্ডেনিহতদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

লোগাং গণহত্যা এমন সময়েসংগঠিত সংঘটিত করা হয় যখন পাহাড়ি জনগণ মহান জাতীয় উতসব বৈ-স-বি(বৈসুক-সাংগ্রাই-বিঝু)উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সে সময় খাগড়াছড়ি বৈসাবি উদযাপনকমিটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করার জন্য ঢাকা থেকে২৮ জন রাজনীতিবিদ, ছাত্রনেতা, শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মীকেআমন্ত্রণ জানায়। এ গণহত্যার ফলে আনন্দোতসব বাতিল হয়ে যায়। শোক ও কান্নায় ছেয়ে যায় সমগ্রপার্বত্য জনপদ। গণহত্যার পর পরই লোগাং এলাকা সেনাবাহিনী কর্তৃক sheield করে দেয়া হয়। বেশ কয়েকদিন পর্যন্ত সেনাবাহিনী এবংতাদের দালাল দোসরদের ছাড়া কোন সাধারণ নাগরিককে উক্ত এলাকায় যেতে দেয়া হয়নি। ঢাকা থেকেআমন্ত্রিত সম্মানীত অতিথিবৃন্দকে সেনাবাহিনী উক্ত গণহত্যা সংঘটিত লোগাং এলাকায় যেতেদেয়নি। পানছড়িতে তাদেরকে আটকানো হয়।

লোগাং গণহত্যা দেশে বিদেশেএক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই ববর্রতার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাতে মুখর হয়ে ওঠেবিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও দেশ বিদেশের বিভিন্নমানবাধিকার সংগঠন। এ গণহত্যার প্রতিবাদে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ’৯২ সালের ২৮শে এপ্রিলখাগড়াছড়ি থেকে পদযাত্রা করে লোগাং পোড়া ভিটায় হত্যাকান্ডে নিহতদের স্মরণে পুষ্পমাল্যদিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।

বার বার দেখা যায়, পাহাড়িদেরবৈসাবি উৎসব ঘনিয়ে এলেই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো তৎপর হয়ে ওঠে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক হামলাসংঘটিত করে। যেমন ২০০৬ সালের মাইসছড়িতে পাহাড়িদের উপর সেটলার হামলার পর বৈসাবির আনন্দোৎসবপ্রতিবাদের মিছিলে পরিণত হয়েছিল। সে সময় বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও রাজপথে নেমেছিল এবং বৈসাবিউৎসব বর্জনের ডাক দিয়েছিল। এরপর ২০১০ সালে সাজেক ওখাগড়াছড়িতে পাহাড়িদের উপর বর্বর সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়। বৈসাবি উৎসব শেষ হতে না হতেই ২০১১ সালে রামগড়েরশনখোলা পাড়া ও মানিকছড়িতে পাহাড়ি গ্রামে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও চট্টগ্রাম থেকে আসা পাহাড়িযাত্রীদের উপর বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়। এ হামলায় আশীষ চাকমা চিরতরেনিঁখোজ হয়ে যায়।

এবার বড় ধরনের কোন ঘটনাসংঘটিত না হলেও খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার বড়নাল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামপ্রাণ কুমার পাড়ায় সেটলাররা বিনা উস্কানিতে পর পর দু’ বার হামলা চালিয়েছে। তাদের হামলারপর উক্ত গ্রামের ২৭টি পাহাড়ি পরিবার এখনো ঘরবাড়ি ও গ্রাম ছাড়া হয়ে মানবেতর জীবন যাপনকরতে বাধ্য হচ্ছেন। বৈসাবি উৎসব শুরু হলেও সেটলারদের হামলার ভয়ে তারা  গ্রামে ফিরে যেতে পারছেন না। সেটলাররা প্রতিনিয়ততাদেরকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।

লোগাং গণহত্যা সহ পার্বত্যচট্টগ্রামে ডজনের অধিক গণহত্যা ও কয়েক ডজন সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তুকোন ঘটনারই আজ পর্যন্ত বিচার করা হয়নি। প্রকাশ করা হয়নি সঠিক তদন্ত রিপোর্টও। পার্বত্যচট্টগ্রামের কোন ঘটনা ঘটলেই সরকার যে কোন প্রকারে হোক ধামাচাপা দিয়ে রাখতে সর্বদা সচেষ্টথাকে। যেভাবে লোগাং গণহত্যার প্রকৃত চিত্র ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল।


পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিতসকল গণহত্যার সঠিক তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও ঘটনার সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করে বিচারেরআওতায় নিয়ে আসার দাবিতে আমাদের আরো বেশি সোচ্চার হতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তরুণপ্রজন্মকেই এসব ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীতে অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়েপড়তে হবে। অন্যথায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে মাথা উচু করে দাঁড়াবার মতো আমাদের আরজায়গা থাকবে না। তাই আসুন আমরা সকল ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ-প্রতিরোধগড়ে তুলি। জুম্ম জনতার জয় হবেই হবে।