সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামে সীমান্ত সড়ক কী প্রাকৃতিক ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহ কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

যেভাবে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা
হচ্ছে সীমান্ত সড়ক

পার্বত্য চট্টগ্রামে ১,০৩৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করছে সেনাবাহিনী। ২০২০ সাল থেকে এ সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ৩১৭ কিলোমিটার সড়কের জন্য ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৮শ ৬১ কোটি টাকা। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ২৮৮ কিলোমিটার সড়কের আরেকটি প্রকল্পের জন্য ৩ হাজার ৬শ ৬৬ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন দিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। সড়কটি নির্মাণ শেষ হতে হতে এর ব্যয় নিশ্চয় হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে। 

অবাধে পাহাড়-বনজঙ্গল কেটে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ

এ সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে অবাধে কেটে ফেলা হচ্ছে বনজঙ্গল, গাছপালা ও পাহাড়-টিলা। এতে প্র্রাকৃতিক ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কোনকিছুই বিবেচনা করা হচ্ছে না। দেশের “সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা” রক্ষায় নিরাপত্তার নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে সবকিছু। এতে পরিবেশ বিপর্যয় হোক কিংবা বনজঙ্গল উজার হোক তাতে কী আসে যায়!

শুধু তাই নয়, এ সড়ক নির্মাণের ফলে আশে-পাশে বসবাসকারী পাহাড়িরা উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন, কারোর জুমভূমি ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। এতে তারা ভোগদখলীয় জায়গা-জমি, বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। কেউ টু শব্দ করারও সাহস পাচ্ছেন না। এ নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে চাইলে “সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে তাকে হয় গ্রেফতার করা হচ্ছে, নয়তো ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এভাবেই জোরজবরদস্তি করেই চলছে সীমান্ত সড়ক নির্মাণের কাজ।

আশ্চার্যের বিষয় হচ্ছে, অবাধে পাহাড় ও বন-জঙ্গল কেটে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করা হলেও পরিবেশ অধিদপ্তর ও দেশের পরিবেশবিদরা একেবারেই নিশ্চুপ। তারা একবার দেখতে গেলে বুঝতে পারতেন যে প্রকৃতি-পরিবেশের জন্য কী সর্বনাশটাই না ঘটছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। কিন্তু না তাদের সেখানে যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। যেন সেনাবাহিনী যা করবে তা সবই জায়েজ!

সড়কটি নির্মাণ শেষ হলে হয়তো যোগাযোগ-যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে। কিন্তু তাতে স্থানীয়দের কতটুকু উপকার হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, এ যাবৎ পাহাড়ে যেখানে যেখানে সড়ক উন্নয়ন করা হয়েছে আমরা দেখেছি সেসব জায়গায় বহিরাগত বাঙালিদের পুনর্বাসন করা হয়েছে, আর পাহাড়িরা উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন। ফলে সীমান্ত সড়কটি যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারবে বটে, পাহাড়িদের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ সড়কটি নির্মাণকালেই তার আলামত স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

প্রাকৃতিক ও পরিবেশ বিপর্যয়ে সীমান্ত সড়কের প্রভাব

সম্প্রতি কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে বন্যা কবলিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে হাটবাজারসহ গ্রামের পর গ্রাম। একই সাথে ঘটেছে পাহাড়ধসের ঘটনা। নেমে এসেছে জনদুর্ভোগ। এখানে দুয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যাক-

ফারুয়া এলাকায় বন্যায় ডুবে গেছে গ্রাম-ঘরবাড়ি। সংগৃহিত ছবি

এবারে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ আশে-পাশের বেশ কিছু গ্রাম বন্যার পানিতে ডুবেছে, যা সোস্যাল মিডিয়াসহ জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে। যেসব গ্রামে আগে কখনো বন্যার পানি উঠতো না সেসব গ্রামও এবার তলিয়ে গেছে পানির নীচে। এর কারণ হিসেবে অনেকে অভিযোগ করেছেন, সীমান্ত সড়ক নির্মাণের কারণে রেইংখং নদীর পানি প্রবাহের পথগুলোতে বাঁধের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আগে যেভাবে অবাধে পানি চলে যেতে পারতো সে সব পয়েন্টগুলো ব্লক হওয়ায় সেতুর নিচ ছাড়া পানি বের হয়ে যাওয়ার পথ আর নেই। এ কারণেই মূলত নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। আর এই আটকে থাকা পানি ফুলে-ফেঁপে উঠে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। আগে যতই বৃষ্টিপাত হোক না কোন নদীর পাড় পর্যন্ত পানি উঠতো। ফলে স্থানীয়রা স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে পারতো। কিন্তু এবারে ফারুয়া বাজার ছাড়াও অনেক গ্রাম, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও ডুবে গেছে।

শুধু তাই নয়, স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেছেন, সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে সেখানকার বহু ছড়া-ঝিরিসহ এলাকার পাড়াবনও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এর ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে এলাকার জনগণকে।

অপর ঘটনাটি হচ্ছে রাঙামাটির রাজস্থলীতে। সেখানে দেখা গেছে সীমান্ত সড়কের বিশাল আকারের একটি অংশ ধসে পড়েছে। আর সড়কের ওপর ধসে পড়েছে পাহাড়। যেখানে সড়কটি ধসে পড়েছে সেটা নাকি সেনাবাহিনী নাম দিয়েছে ‘ভিউ পয়েন্ট’। মূলত পর্যটক আকর্ষণ করতে পাহাড় কেটে সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে, যার কারণে এ ধসের ঘটনাটি ঘটেছে বলে স্থানীয়রা বলছেন।

রাজস্থলীতে ধসে পড়েছে সীমান্ত সড়কের একাংশ। সংগৃহিত ছবি

এ ধরনের পাহাড় ধসের ঘটনা আমরা মহালছড়ি-সিন্দুকছড়ি-জ্বালিয়া পাড়া সংযোগ সড়কেও দেখেছি, যা প্রতিবছর ঘটতে দেখা যায়। এ সড়কটিও অবাধে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে।

উক্ত ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে এটা সুষ্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, অবাধে পাহাড় কেটে, বনজঙ্গল, ছড়া-ঝিরি ধ্বংস করে যে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে তা ভবিষ্যতে আরো বেশি বিপর্যয় ডেকে আনবে। তাই, সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তর এবং দেশের পরিবেশবিদদের উচিত হবে সীমান্ত সড়ক নির্মাণে অবাধে পাহাড় ও বনজঙ্গল ধ্বংস রোধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। অন্যথায় ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত আরো বড় বিপর্যয় এড়ানো কোনভাবেই সম্ভব হবে না।

নিরন চাকমা
১৩.০৭.২০২৬


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন