বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু ঘটনা নিয়ে বিক্ষিপ্ত আলাপ

পার্বত্য চট্টগ্রাম আলোচিত হচ্ছে নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে। প্রতিনিয়ত একটা না একটা ঘটনা আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারী বর্ষণের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, হাসপাতালে যাওয়ার পথে সাজেকে বিজিবি সদস্যদের চালিত সামরিক যানের ধাক্কায় সন্তানসম্ভবা স্কুল শিক্ষিকা সুমন্তি চাকমার মৃত্যুর ঘটনা বেশ আলোচিত হয়েছে। এসব ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে শুরু হয়েছে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বেশ কিছু জায়গায় সেনাবাহিনীর অভিযান। যার জন্য এলাকার জনগণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন পার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব নিয়ে কিছু বিক্ষিপ্ত আলাপ করা যাক। 

🔹কথিত উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ

সরকারের কথিত উন্নয়নের থাবায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন ক্ষতবিক্ষত। সড়ক নির্মাণের নামে পাহাড়-বন উজাড় করে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসাধন, যত্রতত্র পর্যটন স্পট তৈরি করে ব্যবসা, বহিরাগত অনুপ্রবেশ ও বসতিস্থাপনের ফলে ভূমি বেদখল এবং সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন... ইত্যাদির ফলে দিন দিন পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তার মধ্যে বিশ্বের জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাবতো রয়েছেই। আর এতেই প্রকৃতির রুদ্ররূপ আমরা প্রতিবছর দেখতে পাচ্ছি। মনে রাখতে হবে প্রকৃতিকে যদি তার মতো থাকতে দেওয়া না হয় তাহলে সে ভয়ঙ্কররূপে প্রতিশোধ নেয়। আমরা স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা দেখেছি ২০১৭ সালে। কিন্তু এরপরও আমাদের কোন শিক্ষা হয়নি। অপরিকল্পিত উন্নয়ন যে কতটা প্রকৃতি-পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর তা ভবিষ্যত পার্বত্য চট্টগ্রামই হয়তো বলে দেবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে অবাধে পাহাড়-বনজঙ্গল কেটে যে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, অপকিল্পিতভাবে পর্যটন বানানো হচ্ছে তাতে যে পরিবেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে সে বিষয়ে কারোর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। দেশের পরিবেশবিদ দাবিদার যারা রয়েছেন তারা যেমন নিশ্চুপ, একইভাবে বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, লেখক--- তাদের মুখেও কোন রা নেই। বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় বাহিনী-সংস্থাগুলো যা বলবে, যা করবে সবই যেন জায়েজ। এই মেনে নেওয়াটাই যেন দেশে রীতি হয়ে গেছে। আর এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে পার্বত্যবাসীদের।

🔹সাজেকে সন্তানসম্ভবা স্কুল শিক্ষিকার মৃত্যু

গত ১৮ জুলাই সাজেকে হাসপাতালে যাওয়ার সময় বিজিবির গাড়ির ধাক্কায় সিএনজিতে থাকা সন্তানসম্ভবা স্কুল শিক্ষিকা সুমন্তি চাকমার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাটি আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, দেশের মূলধারার গণমাধ্যম বা মিডিয়াগুলো কীভাবে সত্য আড়াল করে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করে। তবে সাজেকের জনগণ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে মিডিয়ার লুকোচুরি খেলা ভেস্তে দিয়েছে। তারা প্রথম আলো পত্রিকা পুড়িয়ে প্রতিবাদ করেছে, অপরাপর মিডিয়াগুলোর প্রতি নিন্দা-ধিক্কার জানিয়েছে। মিডিয়া বিজিবির নাম উল্লেখ না করলেও এখন তারা (বিজিবি) নিজেরাই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, সিএনজির সাথে তাদের গাড়ির ধাক্কা লেখে শিক্ষিকা সুমন্তি চাকমার মৃত্যু হয়েছে। তাহলে এখন মিডিয়া বা গণমাধ্যমগুলো কী ব্যাখ্যা দেবে? তারা কী এখন থেকে সত্য ঘটনা তুলে ধরতে পারবে?

তবে এ ঘটনার নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি। ইতোমধ্যে ২৭ বিজিবির মারিশ্যা জোনের কমান্ডার জাহিদুল ইসলাম জাহিদ (পিএসসি) বলেছেন, তারা বিজিবির পক্ষ থেকে সুমন্তি চাকমার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের জন্য ৩ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো অনুদান আর ক্ষতিপূরণ কি এক জিনিস? এলাকাবাসী নিহত সুমন্তি চাকমার পরিবারের জন্য ১৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ, আহতদের সুচিকিৎসা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক জড়িতদের বিচার ও শাস্তির দাবি করেছেন। ফলে এটা স্পষ্ট যে, তারা অনুদান চাননি। তারা ক্ষতিপুরণ ও ন্যায়বিচার চেয়েছেন। তাহলে অনুদানের বিষয়টি আসে কীভাবে? এই অনুদানের দোহাই দিয়ে কী ঘটনায় জড়িতরা রেহায় পেয়ে যাবেন?

মনে রাখতে হবে, সুমন্তি চাকমা একা মারা যাননি। মারা গেছে তার পেটে থাকা অনাগত শিশুটিও। অর্থাৎ একসাথে দুটি প্রাণ ঝরে গেছে। বিজিবি এ ঘটনাকে সাধারণ “দুর্ঘটনা” হিসেবে চালিয়ে দিতে চাচ্ছে। তারা বলার চেষ্টা করছে সিএনজিটি দ্রুত গতিতে আসার কারণে এ ঘটনাটি ঘটেছে। কিন্তু ঘটনাটি প্রকৃত অর্থে সাধারণ বা স্বাভাবিক দুর্ঘটনা ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, বিজিবির দ্রুতগতির গাড়িটি পিছন দিক থেকেই সুমন্তি চাকমাকে বহনকারী সিএনজিকে ধাক্কা দেয়ার কারণেই ঘটনাটি ঘটেছে এবং তাতে সুমন্তি চাকমা গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। কাজেই, এটাকে পরিকল্পিত ও কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড ছাড়া সাধারণ দুর্ঘটনা বলার কোন সুযোগ নেই। তাই, কিছু ‘অনুদান’ দিয়ে, ‘ভুক্তভোগীর ছেলেকে বিজিবিতে চাকরি দেয়ার’ কথা বলে দোষীরা রক্ষা পেতে পারে না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় তাদের বিচার ও শাস্তি হতে হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

🔹সেনা অভিযান

গত ২১ জুলাই থেকে সেনাবাহিনী খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন জায়গায় কথিত সন্ত্রাস দমনের নামে অভিযান শুরু করেছে। বিশেষ করে তারা ইউপিডিএফের প্রভাবিত এলাকাগুলোকে টার্গেট করে অভিযান পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে। গতকাল (২২ জুলাই) রাঙামাটির কাউখালীতে দুই ভাইয়ের বাড়ি ঘেরাও করে সেনারা পরিবারের লোকজনকে নানা জিজ্ঞাসাবাদের নামে হয়রানি করেছে, আজ (২৩ জুলাই) খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের রবিজয় পাড়ায় ইউপিডিএফ এক সংগঠকের বাড়িতে হানা দিয়ে তল্লাশি ও তার ১০ম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেকে আটক করে নেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে বলে খবর এসেছে।

এই সেনা অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে ন্যায্য আন্দোলন দমন করা। মূলত ইউপিডিএফ যে পাহাড়িদের সংগঠিত করে গণআন্দোলন পরিচালনা করছে তা বন্ধ করে দেওয়া। তাদের এই অভিযানে সাধারণ জনগণ নানা নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ইউপিডিএফকে সমর্থন করার কারণে কিংবা ইউপিডিএফ সদস্য সন্দেহ তারা সাধারণ মানুষের ওপর এই নিপীড়নগুলো চালাচ্ছে। নিপীড়নের ভয়ে সাধারণ জনগণকে সবসময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করতে হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা এখন পার্বত্য চট্টগ্রামে দৈনন্দিন চিত্র। ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত করা প্রত্যেক নাগরিকের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার হলেও সেনাবাহিনী বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই আন্দোলন দমন করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা স্পষ্টতই সংবিধান ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এ ধরনের নিপীড়ন ও হয়রানিমূলক সেনা অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।

🔹বিবিধ

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে এক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক বিভাজন, ধর্মীয় বিভাজনের পাশাপাশি বেড়েছে মাদকের কারবার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরাধ ও অসামাজিক কার্যকলাপের প্রবণতা। শাসকগোষ্ঠির যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া একটি জাতির জন্য এসব নিঃসন্দেহে কোন শুভ লক্ষণ নয়। এগুলো সমাজ, জাতিকে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এর থেকে উত্তরণ এতটা সহজ নয়, তবে অবশ্যই উত্তরণ ঘটাতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রয়াস, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও ন্যায়নিষ্ঠ অবস্থান এর থেকে উত্তরণ সম্ভব।

নিরন চাকমা
২৩.০৭.২০২৬

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন