![]() |
| সংগৃহিত ছবি |
এ উৎসবটি ত্রিপুরারা “বৈসুক/বৈসু”, মারমারা “সাংগ্রাই”, চাকমারা “বিঝু”, তঞ্চঙ্গ্যারা “বিষু”, গুর্খা-অহোমিরা “বিহু”, খেয়াংরা “সাংলান’, খুমিরা “সাংক্রাই”, চাকরা “সাংগ্রাইং”, ম্রোরা “চাংক্রান”, সান্তালরা “বাহা পরব” নামে এবং অন্যান্য জাতিসত্তাগুলোও নিজস্ব নামে উৎসবটি পালন করে। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে উৎসবটি কয়েকটি জাতিসত্তার উৎসবের আদ্যাক্ষর নিয়ে বৈ-সা-বি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে (বিশেষত খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে) এবং এ নামে বিভিন্ন অনুষ্ঠান (র্যালি, নদীতে ফুল অর্পণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি) করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে এ উৎসবকে ঘিরে বেশ কিছুদিন থেকে বিভিন্ন জায়গায় খেলাধুলা, মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রাসহ চলছে নানা আয়োজন।
বর্তমানে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে এসব অনুষ্ঠানের আয়োজনগুলো। মুহুর্তের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্ববাসীর কাছে। মেলায় পসরা সাজিয়ে বসেছেন ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিল্পীরা নাচ, গান, নাটক পরিবেশন করছেন। মেলাগুলোতে মদ বেচা-কেনা ও ‘জুয়ার আসর’ বসার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রাঙামাটি জেলা পরিষদের আয়োজিত মেলায় উঠতি বয়সী তরুণদের মদ খেয়ে মারামারি করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে। সেখানে নাকি তিন দফায় মারামারির ঘটনা ঘটেছে, অনেকে আহতও হয়েছেন। ফলে এখন “বিঝু মেলার” নামে কী চলছে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এই উৎসবটি মূলত চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে আবর্তিত। এই চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে পাহাড়িরা ছাড়াও বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ও পূজা-পার্বণ করে থাকে। সমতলের বিভিন্ন জাতিসত্তাও এ নিয়ে পূজা-উৎসব পালন করে। পাহাড়িরা সম্প্রদায় ভেদে প্রায় সপ্তাহ ব্যাপী উৎসবটা পালন করে থাকে।
এই চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে আগে ব্যবসায়ীরা ক্রেতা বা ভোক্তাদের কাছ থেকে পুরনো বছরের বকেয়া আদায়ে ‘হালখাতা” অনুষ্ঠান করতেন, যাকে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ‘চৈত কাবারি” বলে থাকেন। ক্রেতা বা ভোক্তাকে পুরনো বছরের বকেয়া টাকা পরিশোধ করে নতুন বছরের জন্য নতুনভাবে দোকানদার বা ব্যবসায়ীর সাথে লেনদেন শুরু করতে হয়। তবে এখন এই ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান করা হয় কিনা জানা নেই।
পাহাড়িরা (বিশেষত চাকমারা) এই উৎসব পালন করেন মূলত বাংলা বর্ষপঞ্জি বা বঙ্গাব্দ অনুসারে। আর মারমা সম্প্রদায় মঘী সন/বর্ষপঞ্জি অনুসারে তাদের উৎসব পালন করে থাকেন। এই বর্ষপঞ্জি অনুসারেই মাস নির্ধারণ এবং জমিতে ফসল বোনা, ফসল তোলা ইত্যাদি হয়ে থাকে। তাই উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্যটাই হচ্ছে, পুরাতন বছরকে বিদায় ও পুরাতন বছরের দুঃখ, গ্লানি দূরীভূত করে নতুন বছরে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি কামনা করা। প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে যে মেলবন্ধন তাকে আরো বেশি সুদৃঢ় করা। যার কারণে চাকমাদের উৎসবের প্রথম দিন অর্থাৎ “ফুল বিঝু”র দিন ভোরে ফুল তোলা, ফুল দিয়ে ঘরবাড়ি সাজসজ্জা করা. গৃহপালিত পশু বিশেষত গরু-ছাগল-মহিষকে ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের গোসল করানো, এদিন থেকে ৭ দিন পর্যন্ত বটবৃক্ষ বা সবুজ বৃক্ষের তলায় ও নদীতে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করা; দ্বিতীয় দিন “মূর/মূল বিঝু”তে হাস-মুরগিকে খাদ্য দেওয়া ও ঘরে ঘরে অতিথি আপ্যায়ন; উৎসবের তৃতীয় দিন অর্থাৎ ‘গজ্যাপজ্যা দিন’ বা পহেলা বৈশাখ গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেওয়া ও সামর্থ্য অনুসারে তাদের জন্য উন্নত খাবার পরিবেশন করার রীতি রয়েছে (বর্তমানে বিহার/মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করা হয়)। এসবের মাধ্যমে মানুষ, প্রকৃতি ও প্রাণীদের মধ্যে কী নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে তা সহজেই বুঝা যায়।
উৎসবে এ পাড়া থেকে ওই পাড়ায়, এ ঘর থেকে ও ঘরে ঘুরে বেড়ানো, পাজনসহ উপাদেয় খাদ্য খাওয়া মানুষের মধ্যে ঐক্য, সংহতিকে আরো সুদৃঢ় করে। যার জন্য বিঝুর সময় সবার জন্য ঘরের দরজা উন্মুক্ত থাকে। কোন ধরা-বাধা ছাড়াই যে কেউ, যে কারোর বাড়িতে অতিথি হিসেবে আপ্যায়িত হন। বরং, বাড়িতে অতিথি না এলে গৃহস্থ মনে সুখ অনুভব করেন না।
এখন আধুনিকতার বদৌলতে উৎসবের ধরণও অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটেছে। আগের রীতি-নীতিগুলো এখন খুব কমই পালন করা হয়। এখন আমরা দেখি র্যালি, মেলা, নাচ-গানের আসর। ফুল বিঝুতে নদীতে ফুল অর্পণ করে প্রার্থনা করাটাও এখন উন্নতরূপ পেয়েছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে নদীতে ‘ফুল ভাসিয়ে’ দিতে দেখা যায়, যা সঠিক নিয়ম নয়।
আগেকার সময়ে যার যার মতো নদী/ছড়া পাড় বা কুয়াঘাটে নিরবে-নিবৃত্তে ফুল-বাতি দিয়ে একান্ত মনে সুখ-শান্তির প্রার্থনার পর গোসল করে পবিত্র মনে ঘরে ফিরতো, এতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতেন মায়েরা। আর এখন সেজেগুজে দলবদ্ধভাবে নদীতে ফুল অর্পণ করে কিংবা ‘ফুল ভাসিয়ে’ দিয়ে মোবাইলে সেলফি তোলা, ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ করে ফেইসবুকে প্রচার করা-- হয়ে উঠেছে উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ। নতুন প্রজন্ম হয়তো অতীতের রীতি-নীতি ভুলে এটাকেই প্রকৃত রীতি-নীতি হিসেবেই মেনে নেবে।
তবে আমাদের সবারই মনে রাখতে হবে, শিকড় চ্যুত হয়ে একটি গাছ যেমন বড় হতে পারে না, একইভাবে অতীতের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি-ঐতিহ্য কিংবা রীতি-নীতি ভুলে একটি জাতিও উন্নত জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। অতি আধুনিতার ফলে জাতি তার শিকড় চ্যুত গাছের মতো হয়ে পড়তে বাধ্য।
আশার কথা হচ্ছে- চাকমা সার্কেল চীফ দেবাশীষ রায়সহ অনেকে পাহাড়িদের উৎসবের সময় পালিত অতীতের সমৃদ্ধ রীতি-নীতিগুলো ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে পালনও করা হচ্ছে।
আমাদেরকে অবশ্যই অতীতের সমৃদ্ধ সংস্কতি-ঐতিহ্য, রীতি-নীতি ও বৈচিত্র্যকে ধারণ করেই আধুনিক সংস্কৃতির দিকে অগ্রসর হতে হবে।
অন্যথায় জাতির ঐতিহ্য-সংস্কৃতি আমরা সঠিকভাবে রক্ষা করতে পারবো না। সুতরাং, আধুনিকার গড্ডালিকা প্রবাহে জাতির ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, রীতি-নীতিগুলো যেন হারিয়ে না যায় তার জন্য আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।
#নোট: এই লেখাটি আমার নিজস্ব অবস্থান থেকেই লেখা। ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। যাদের এ বিষয়ে ভালো ধারণা রয়েছে, যারা জ্ঞানী-গুণী ও ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, রীতি-নীতি বিষয়ে অভিজ্ঞ তারা যদি আরো সমৃদ্ধভাবে এ বিষয়ে লেখেন তাতেই জাতির উপকার হবে।
নিরন চাকমা
১১.৪.২০২৬

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন