তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার “বাংলাদেশে সবাই
সমান অধিকার ভোগ করবে এবং সকলের পরিচিতি হবে বাংলাদেশী” এমন তত্ত্ব হাজির করেছে, যাতে
আপাত দৃষ্টিতে খুবই ভালো মনে হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ভিন্ন উদ্দেশ্য,
সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোকে বিলীন করে দেয়ার সুক্ষ্ম পরিকল্পনা।
বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, “আমরা পাহাড় সমতলে যারাই আছি, আমাদের একটাই পরিচয়- আমরা সবাই বাংলাদেশী। জাতির সকল অংশ তথা ধর্মীয়, আঞ্চলিক ও নৃ-গোষ্ঠীগত পরিচয় এবং নারী পুরুষ নির্বিশেষে সব শ্রেণি ও গোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে একটি সুসংহত জাতি গঠন করাই বিএনপি’র লক্ষ্য।”
আমরা সকলে জানি আওয়ামী লীগ সরকারও একইভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রয়োগ করে বাংলাদেশের সকল জাতিগুলোকে সাংবিধানিকভাবে বাঙালি বানিয়েছিল। বর্তমানে বিএনপি’র বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মধ্যেও একই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য যে রয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশে বসবাসরত সংখ্যালঘু জাতিগুলো নাগরিকত্বের দিক দিয়ে অবশ্যই বাংলাদেশী। তাতে কারোর কোন দ্বিমত নেই। তবে বাংলাদেশী হিসেবে নাগরিকত্ব পরিচয়ের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব জাতিগত আলাদা আলাদা পরিচয় রয়েছে। যেমন- চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, ম্রো, খেয়াং, চাক, সাঁওতাল, গারো, ওঁরাও, মুনিপুরি... ইত্যাদি। এসব জাতিগুলোর রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, প্রথা ব্যবস্থা।
প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আড়ালে এসব জাতিগুলোর পরিচয় কি বিলীন হয়ে যাবে? আমরা জানি বাঙালি বা মুসলমানরা বাংলাদেশে প্রধান সংখ্যাগরিষ্ট জাতি। সবক্ষেত্রে তাদের একাধিপত্য রয়েছে। কাজেই, তারা নিজেদের বাংলাদেশী বলুক আর যাই বলুক না কেন তাদের তো বিলীন হয়ে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ছোট ছোট জাতিগুলো তো কখনো বাংলাদেশী, কখনো বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিলীন হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সেজন্য তারা চায় সংবিধানে জাতিগত পরিচয় অন্তর্ভু্ক্তির মাধ্যমে দেশে যে তাদের বসবাস রয়েছে তার স্বীকৃতি পেতে। কিন্তু এদেশের সরকারগুলো বা শাসকগোষ্ঠি তা না করে কখনো বাঙালি জাতীয়তাবাদ, কখনো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দিয়ে এসব জাতিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে মরিয়া। যদিও তারা চিড়িয়াখানার জীব-জন্তু প্রদর্শনীর মতো জাতীয় কোন অনুষ্ঠানে এসব জাতির সংস্কৃতিকে নির্লজ্জভাবে দেশীয় ও বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে। কিন্তু যখন অধিকারের প্রশ্ন আসে, জাতিগত পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্ন আসে তখন তারা সেটা দেয় না। উল্টো “বিচ্ছিন্নতাবাদী”, “সন্ত্রাসী” আখ্যা দিয়ে দমন-নিপীড়ন চালায়। পার্বত্য চট্টগ্রামই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
আমাদের সকলের মনে রাখতে হবে যে, বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ১৯৭৯-৮০ সালে সমতলের চার লক্ষাধিক বাঙালিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করে পাহাড়িদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার চক্রান্ত করেছিলেন। বিএনপি সেই চক্রান্ত থেকে এখনো সরে যায়নি।
বিএনপি আরেকটি তত্ত্ব সামনে নিয়ে এসেছে সেটি হলো পাহাড়-সমতলে সকলের “সমানাধিকার”। অর্থাৎ দেশে বসবাসকারী সকলে সমান অধিকার ভোগ করবে। সরকার এখন এ তত্ত্ব ফেরি করছেন তার দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও হরহামেশা এই তত্ত্ব বলে যাচ্ছেন। কিন্তু বিএনপি সরকারের এই সমানাধিকার তত্ত্বের বলি-ও হতে হবে ছোট ছোট জাতিগুলোকে। এর মাধ্যমে তারা আরো বেশি পিছনে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, সরকার বলছে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সকলে সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে বা চাকরি পাবে। সংখ্যালঘু জাতি বলে আর কোন কোটা সুবিধা থাকবে না। এখানেই হচ্ছে যত সমস্যা। কারণ ১৭-১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে মাত্র কয়েক লক্ষ হচ্ছে ছোট ছোট বিভিন্ন জাতিসত্তার লোকজন। এর মধ্যে শিক্ষা, চিকিৎসা থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে রয়েছে। এখন যদি কোটি কোটি মানুষের সাথে কয়েক লক্ষ মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে তাহলে কীভাবে ছোট ছোট জাতিগুলো টিকতে পারবে? তাদের অবশ্যই টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। আর সেখানেই তারা হোচট খেয়ে নীচে পড়ে যাবে। তাহলে তারা কীভাবে সমানাধিকার পাবে?
আর পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে সেখানে কী দেখতে পাই? সেখানে আমরা সেনাশাসন জারি থাকতে দেখি, অন্যায়-অবিচার, দমন-পীড়ন দেখি, সেখানে ভূমি বেদখল হতে দেখি, সেখানে উন্নয়নের নামে পাহাড়িদের উচ্ছেদ হতে দেখি। সরকার যদি আন্তরিকভাবে সমানাধিকার প্রয়োগ করতে চায় তাহলে আগে সেখান থেকে সেনাশাসন তুলে নিয়ে সমতলের মতো গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সেখানে যে চার লক্ষাধিক বাঙলিকে পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসন করে জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে। পাহাড়িদের যে সমস্ত জমি-জমা বেদখল হয়েছে সেগুলো ফেরত দিতে হবে। ডিসি, এসপি, ইউএনও, সেনা অফিসার থেকে শুরু করে সকল সরকারি দফতরে সমানভাবে পাহাড়িদের থেকে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু সরকার কী তা করবে? সেটা যদি করা না হয় তাহলে কীভাবে সেখানে সমানাধিকার প্রয়োগ হবে?
সুতরাং, বিএনপি সরকারের ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ ও ‘সমানাধিকার’ তত্ত্বের মাধ্যমে পাহাড়িসহ দেশের ছোট ছোট জাতিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার যে সুক্ষ্ম কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে তা থেকে সংখ্যালঘু জাতিগুলোকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
নিরন চাকমা
২৪.০৪.২০২৬

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন