জাতিগত আত্মপরিচয়ের সাথে একটি জাতির অস্তিত্ব নিহিত রয়েছে। আত্মপরিচয়হীন জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জুম্ম বা পাহাড়িরা এই দশায় পড়েছে। তারা এখন আত্মপরিচযের গ্লানি বা সংকটে ভুগতে বাধ্য হচ্ছে। রাষ্ট্রই এই সংকট তৈরি করে রেখেছে।
![]() |
| সংগৃহিত ছবি |
জাতিসত্তাগুলোর জাতিগত পরিচয় বিলুপ্ত করে দেওয়ার সবচেয়ে ঘৃণ্য কাজটি করা হয়েছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে। সেখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে বসবাসকারী সবাইকে বাঙালি বানানো হয়েছিল। তৎসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এর কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সংবিধানে বাংলাদেশী
জাতীয়তাবাদ অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের জাতিসত্তাগুলোর জাতিগত
পরিচয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। এরপর আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়
আসার পর ’৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রবর্তনের নামে ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী আইন
পাস করে সংবিধানে পুনরায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর এতে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ
দেশে বসবাসকারী বাঙালি ভিন্ন অপরাপর জাতিসত্তাগুলোর ওপরও বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দেওয়া
হয়। এর বিরুদ্ধে ইউপিডিএফ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামে সর্ববৃহৎ মানববন্ধনসহ
ধারাবাহিকভাবে নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করলেও অন্যান্য কোন দল বা সংগঠন তা করেনি।
চব্বিশের জুলাই গণঅভুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাঙালি জাতীয়তা
চাপিয়ে দেওয়া সেই বিতর্কিত ধারাটি এখনো সংবিধানে বহাল রয়েছে।
আমরা আরো দেখি যে, ৭২ সালের সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরোধীতা করার মধ্য দিয়ে
পরবর্তীতে সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্বদানকালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদ’
প্রবর্তনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়িদেরকে ‘জুম্ম জাতি’ হিসেবে পরিচিতির
চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সফল হতে পারেননি। তার দল জনসংহতি সমিতি প্রথম দিকে
তাদের দাবিনামায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘জুম্মল্যান্ড’ করার দাবি জানালেও পরে সে দাবি
থেকে তারা সরে আসে এবং ’৯৭ সালে উপজাতি শব্দটি মেনে নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে!!
কিন্তু বলাবাহুল্য যে, তারা উপজাতি শব্দটি মেনে নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও বর্তমানে
“আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানাচ্ছে, যা তাদের দ্বিচারিতাকে স্পষ্ট করে। অপরদিকে
এই চুক্তির ‘উপজাতি’ শব্দটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে শাসকগোষ্ঠি ও সেটলার বাঙালিরা।
এখানে প্রসঙ্গক্রমে এটাও উল্লেখ করা দরকার যে, বিগত ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন
সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি গঠন করে তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের পক্ষ থেকে ইউপিডিএফ
সেই কমিটির কাছে লিখিতভাবে দেশে বসবাসরত ৪৫টির অধিক জাতিসত্তাগুলোকে (চাকমা, মারমা,
ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, খেয়াং, ম্রো, খুমি, চাক, পাংখো, সাঁওতাল, গারো, মুনিপুরি, ওরাও...
প্রভৃতি) সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জাতিগত স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছিল। চব্বিশের
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাছেও
ইউপিডিএফ একই দাবি জানিয়েছে।
বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার আবার সংবিধান সংশোধন করে
বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ অন্তর্ভুক্তির কথা বলছে। তবে
তারা দেশে বসবাসরত ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তাগুলোর জাতিগত পরিচয় সংবিধানের অন্তর্ভুক্তি
বাদ দিয়ে সকলের একমাত্র পরিচয় “বাংলাদেশী”--এটা প্রাধান্য দেবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
কারণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যেই সেটাই বলছেন।
কাজেই, এই যে জাতিগত আত্মপরিচয়ের গ্লানি বা সংকট, এর থেকে মুক্তির জন্য আমাদেরকে পার্বত্য
চট্টগ্রামসহ দেশে বসবাসরত ভিন্ন ভাষাভাষী সকল জাতিসত্তার জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে নিজ নিজ
জাতিগত পরিচতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির দাবিতে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায়,
আত্মপরিচয়ের গ্লানি নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। আর অপরদিকে পার্বত্য চুক্তি ও সংবিধানের
দোহাই দিয়ে দীপেন দেওয়ানের মতো নেতা ও সুশীলদের মুখে সংসদ কিংবা সভা-সেমিনারে ‘উপজাতি’
শব্দটি উচ্চারিত হতেই থাকবে।
নিরন চাকমা
১৯.০৬.২০২৬
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন