মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

ড. গৌতম চাকমার পার্বত্য চুক্তি বিষয়ে মন্তব্যকে ঘিরে সমালোচনা সম্পর্কে কিছু কথা

সম্প্রতি গত ১ আগস্ট ২০২৬ (১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম হওয়ার দিনে) পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাবেক সভাপতি অঙ্কন চাকমার সঞ্চালনায় আয়োজিত এক অনলাইন আলোচনায় ভারতের ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. গৌতম চাকমার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিষয়ে করা মন্তব্যকে ঘিরে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জেএসএস (সন্তু)-এর কিছু নেতা-কর্মী ও তাদের পক্ষের কিছু লোকজনকে নানা সমালোচনায় মেতে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে তারা সঠিকভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গৌতম বাবুকে নিয়ে নোংরা ভাষায় সমালোচনাসহ তাঁকে খারাপভাবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।

মূলত সেদিন আলোচনার সঞ্চালক অঙ্কন চাকমার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিষয়ে প্রশ্নের জবাবেই গৌতম চাকমা সে বিষয়ে কিছু যৌক্তিক কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘কোন চুক্তি যদি আইনের মাধ্যমে হয় তাহলে সেটা বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যায়। কিন্তু যে চুক্তিটা করা হয়েছিল সেটা কোন আইন বা অ্যাক্টের মাধ্যমে করা হয়নি। জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার নেতৃত্বে যারা এটা সাইন করেছে এতে অনেক ক্ষেত্রে ভুল হয়েছে। সবচেয়ে বড় ভুলটা ছিল এটা কোন কনস্টিটিউশনের (সংবিধানের) সেইফগার্ডের মাধ্যমে সাইন করা হয়নি। ফলে এই চুক্তিটা কোন আইনের মাধ্যমে ইমপ্লিমেন্টেশন (বাস্তবায়ন) হবে সেটার কোন উল্লেখ নেই। যার কারণে সরকারের একটা এডভান্টেজ হয়ে যায় এটাকে ইমপ্লিমেন্ট (বাস্তবায়ন) না করার।”

তিনি আরো বলেছেন, “চুক্তির মধ্যে যদি একটা ডিমান্ড থাকতো, কনস্টিউশনের কোন একটা আর্টিকেল সংযোজনের মাধ্যমে এটা করা হতো তাহলে ভালো হতো।”

তাঁর এসব বক্তব্যে তো কোন ভুল আছে বলে মনে হলো না। যেটা সত্যিই সেটা তিনি বলেছেন। যা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা নিজেও চুক্তি করে প্রতারিত হওয়ার কথা হরহামেশাই বলে থাকেন।

কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরকারী দলের পক্ষের অনেকে তার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে যুক্তি দিয়ে বলার চেষ্টা করছেন যে, চুক্তিটা ছিল একটি রাজনৈতিক সমঝোতা। আর চুক্তি নিজেই কিছু আইন তৈরি করেছে।

প্রকৃত অর্থে গৌতম বাবুর মন্তব্য তো সেটা ছিল না। তিনি বলেছিলেন যে, চুক্তি কোন আইন বা অ্যাক্টের মাধ্যমে হয়নি। এটা কনস্টিটিউশনের সেইফগার্ডের মাধ্যমে না করাটাই সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে।

সুতরাং, এক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষরকারী দলের পক্ষের লোকজন যে যুক্তি দিচ্ছেন তা ধোপে টেকে না। কারণ গৌতম বাবু চুক্তির পরের আইনগুলোর বিষয়ে কথা বলেননি। তিনি চুক্তি করার সময় যে ভুল হযেছে তা বলেছেন। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন যে, সংবিধানের ধারা বা আইন অনুসারে চুক্তিটা করা হয়নি। যার ফলে সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

আর তিনি চুক্তিতে সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে যেটা উল্লেখ করেছেন সেটা হচ্ছে চুক্তিতে সাংবিধানিক নিরাপত্তা বা গ্যারান্টি না থাকাটা। কিন্তু সেটা নিয়ে সমালোচনাকারীরা কিংবা জেএসএস-এর নেতা-কর্মী বা চুক্তি স্বাক্ষরকারী দলের পক্ষের লোকজন কোন যু্ক্তি দিতে পারছে না।

আমরা নিশ্চয় জানি যে, চুক্তির মাধ্যমে ‘জেলা পরিষদ আইন (এ আইনটি মূলত ১৯৮৯ সালে প্রণীত)’, ‘আঞ্চলিক পরিষদ আইন’, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন’-এগুলো প্রণীত হয়েছে। কিন্তু এই আইনগুলো তো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে আইনগুলো জাতীয় সংসদে পাস হলেও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় এই আইনগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং ২০১০ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট বিভাগ আঞ্চলিক পরিষদ আইনকে সম্পুর্ণভাবে ও জেলা পরিষদের কিছু ধারাকে অসাংবিধানিক মর্মে রায় দিয়েছিল।

চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় তাঁর এক ভিডিওতে (ভিডিওটি তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে রয়েছে) বলেছিলেন, “২০১০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮ সম্পূর্ণভাবে এবং ১৯৯৮ এর পার্বত্য জেলা পরিষদ সংশোধনী আইনের কিছু বিধান হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক অসাংবিধানিক ও বেআইনি মর্মে ঘোষিত হয়। তাই হয়েছিল কারণ সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ প্রত্যক্ষভাবে সংবিধানে স্বীকৃত ছিল না এবং বর্তমানেও নেই। যদি স্বীকৃত থাকতো তাহলে এই আইনগুলো সংবিধান বহির্ভুত মর্মে বিবেচিত হতো না এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭-এর অ-বাস্তবায়নের সংকটও হয়তো এতো প্রকট হতো না।”

রাজা বাবুর উক্ত বক্তব্য পার্বত্য চুক্তি বিষয়ে ড. গৌতম চাকমার অবস্থানকেই সমর্থন করে।

মূলত গৌতম বাবুকে সমালোচনা ও হেয়প্রতিপন্ন করার মূল কারণ হলো, তিনি তাঁর পরিচালিত সংগঠন ‘হিউম্যানিটি প্রটেকশন ফোরাম’কে জেএসএসের পক্ষে ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। ফলে সেদিন অনলাইন আলোচনায় তাঁর আলোচক হিসেবে থাকার বিষয়ে জানতে পেরে জেএসএস (সন্তু)-এর পক্ষ থেকে তাঁকে আলোচনায় অংশ না নিতে বিভিন্নভাবে বাধা প্রদান করা হয়। তাদের পরিচালিত বিভিন্ন বেনামি ফেসবুক পেইজ, আইডি থেকে তাঁকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি তাদের বাধা উপেক্ষা করে উক্ত আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। যার কারণে তারা এখন গৌতম বাবুর বিরুদ্ধে নোংরা ভাষা ব্যবহার করতেও দ্বিধা করছে না।

এখন প্রশ্ন হলো, পার্বত্য চুক্তি কী কোন ধর্মীয় গ্রন্থ যে তার কোন ভুল তুলে ধরা যাবে না, কোন বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না? জেএসএস কী সেটাই মনে করে?

চুক্তির ভুল-ভ্রান্তি তুলে ধরা, সমালোচনা করার অধিকার সমগ্র জনগণের রয়েছে। চুক্তির সমালোচনা করার কারণে কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করা, কাউকে হেনস্তা করা, কাউকে হত্যা করা- কারোর অধিকার হতে পারে না। কিন্তু জেএসএস শুরু থেকেই চুক্তির সমালোচনাকে ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে আসছে। তবে, জনগণ এবং নুতন প্রজন্ম আর আগের মতো মুখ বুঝে থাকতে ও মিথ্যা নিয়ে পড়ে থাকতে রাজী নয়। তারা প্রকৃত সত্য জানতে আগ্রহী।

ড. গৌতম চাকমা চুক্তির যে ভুলের কথা তুলে ধরেছেন দীর্ঘ ২৯ বছরেও চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়াই তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। কাজেই, আর দেরী না করে জেএসএস (সন্তু)-কে নির্দ্বিধায় ভুল স্বীকার করে চুক্তি পরবর্তী প্রণীত আইনগুলোকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করাসহ চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ও জুম্ম জনগণের প্রকৃত রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সকল পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া এখনই উপযুক্ত সময়। ইউপিডিএফও অনেক আগে থেকেই জেএসএসের প্রতি এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছে। কাজেই, জেএসএস যদি এটা করার সাহস রাখে তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন জোরদার করা সম্ভব।

সুফী সাধক লালন শাহ তাঁর একটি গানের অংশে বলেছেন-

“অসময়ে কৃষি কইরে মিছামিছি খেটে মরে,

গাছ যদিও হয় বীজের জোরে, ফল ধরে না তাতে, ফল ধরে না

সময় গেলে সাধন হবে না।”

----------------

নিরন চাকমা

০৪.০৮.২০২৬

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন