স্বৈরাচারী এরশাদ ১৯৮৯ সালে তিন পার্বত্য জেলায় গঠন করেন স্থানীয় সরকার
পরিষদ। নাম দেওয়া হয় ‘রাঙামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ’, ‘বান্দরবান পার্বত্য
জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ’ ও ‘খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ’। তৎকালীন
শান্তিবাহিনী তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এ পরিষদগুলো মেনে নেয়নি।
শান্তিবাহিনীর বিরোধীতার মুখে এরশাদ ’৮৯ সালের ২৫ জুন আয়োজন করেন উক্ত তিন পরিষদের নির্বাচন। শান্তিবাহিনী এ নির্বাচনকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েও তা কার্যকর করতে পারেনি। এরশাদ সরকার যেনতেনভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করে ফেলে। নির্বাচনে রাঙামাটি থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন গৌতম দেওয়ান, খাগড়াছড়ি থেকে সমীরণ দেওয়ান ও বান্দরবান থেকে সাচিং প্রু জেরি। শান্তিবাহিনী তাদেরকে দালাল ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা জোরদার করে। সেই যে নির্বাচনটা হলো আজ পর্যন্ত আর কোন নির্বাচন হয়নি।
১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করলে তার সরকারের পতন ঘটে। এরপর ১৯৯১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসলে তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদগুলো বহাল রাখে। এ পরিষদগুলো যেন দালাল উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এরই মধ্যে ১৯৯২ সালে রাঙামাটিতে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সমাবেশে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গৌতম দেওয়ান রাঙামাটি স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বাকী দুই পরিষদের চেয়ারম্যানরা বহাল তবিয়তে থাকেন।
প্রথম মেয়াদের (৫ বছর) পরবর্তী থেকে পরিষদগুলোতে ক্ষমতাসীন সরকারের দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হতে থাকে। যারা ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ত কিংবা যাদের সেনাবাহিনীর সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল তাদেরকে এ পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য পদে বসানো হয়।
এমতাবস্থায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ‘৯৮ সালে তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদগুলোর আইনের কিছু ধারা-উপধারা, শব্দ-বাক্য রহিত বা সংশোধন-সংযোজন করে পার্বত্য জেলা ‘স্থানীয় সরকার পরিষদ’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ’, ‘খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ’ ও ‘বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ’ নামে পুনর্গঠন করা হয়।
এরপর থেকে এই জেলা পরিষদগুলোকে সম্পূর্ণ দলীয় নেতাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়, যা বর্তমান পর্যন্ত বহাল রয়েছে। দেশে যে সরকার ক্ষমতায় আসে সে সরকার নির্বাচন ছাড়াই ফ্যাক্স বার্তার মাধ্যমে দলীয় নেতা ও দলের অনুগত ব্যক্তিদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নিয়োগ দিয়ে থাকে।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর কোনো পরিবর্তন আসেনি। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কোনো দলীয় না হলেও রাষ্ট্রীয় বিশেষ ক্ষমতাধর মহলের প্রেসক্রিপশনে জেলা পরিষদগুলো পুনর্গঠন করে চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিয়েছিল। একইভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হওয়া বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও সম্প্রতি তাদের দলীয় নেতাদেরকে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নিয়োগ দিয়েছে। তাই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো কী সরকার দলীয় নেতাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র?
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেককে নানা প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা যাচ্ছে। আবার অনেকে নিয়োগ পাওয়াদের অভিনন্দনও জানাচ্ছেন।
মূলত এ জেলা পরিষদগুলোকে অনেকে “জ্বালা পরিষদ”, অনেকে “ফ্যাক্স পরিষদ” অনেকে “দুর্নীতির আখড়া” আবার অনেকে ‘সরকার দলীয় নেতাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।
প্রথম আলোর বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি বুদ্ধজ্যোতি চাকমা তাঁর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন,...“এমনিতে পরিষদগুলোকে ফ্যাক্স পরিষদ বলা হয়। যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকারের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের জন্য পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে তিন জেলায় তিনটি ফ্যাক্স পাঠানো হয়। আবার ফ্যাক্সে নাম অন্তর্ভূক্তির জন্য শুধু ক্ষমতাসীন দলের হলে চলে না, স্ট্যান্ডিং গভর্ণমেন্টের সম্মতিও নিতে হয়। তাই ক্ষমতার পালা বদল হলে পরিষদের পদ প্রত্যাশীদের নিজ দল এবং সবচেয়ে বেশি পার্বত্য অঞ্চলের স্ট্যান্ডিং গভর্ণমেনন্টের হর্তাকর্তাদের কাছে দৌড়ঝাঁপে তৎপর দেখা যায়। নির্বাচনের কথা বলা হয়, কিন্তু পরিষদগুলোর জন্মলগ্নে ১৯৮৯ সালে যে নির্বাচন হয়েছিল সেটিও সিলেক্টিভ ইলেকশন। তখন হাসির খোরাক হয়েছিল।”
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে অবাধ দুর্নীতি, চাকরিতে ঘুষ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। জেলা পরিষদে ন্যস্ত দপ্তরগুলোতে কেউ চাকরি নিতে চাইলে তাকে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এমনকি নারী চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধাও নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠতে দেখা যায়। দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সদস্যরা ‘আঙুল ফুলে কলাগাছে’ পরিণত হয়ে যান। তাদের গাড়ি-বাড়িসহ সহায়-সম্পত্তির পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার কারণে সরকারি দল থেকে যে-ই জেলা পরিষদে নিয়োগ পান তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় না। এই হচ্ছে জেলা পরিষদগুলোর বাস্তবতা।
এদিকে, সম্প্রতি তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান-সদস্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে চুক্তি স্বাক্ষরকারী পক্ষের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। তারা বলতে চাচ্ছেন যে, “জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে আন্দোলন ও চুক্তির মাধ্যমে জেলা পরিষদগুলো পাওয়া গেছে। কিন্তু চুক্তির ২৯ বছর হতে চললেও এখনো যে সরকার ক্ষমতায় আসে সে সরকার নিজের দলীয় লোক দ্বারা জেলা পরিষদগুলোকে লুটেপুটে খাচ্ছে।”
এখন তারা চুক্তি অনুযায়ী স্থায়ী বাসিন্দাদের ভোটার তালিকা প্রণয়নের মাধ্যমে জেলা পরিষদ নির্বাচনের দাবি তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, চুক্তি বাস্তবায়ন কিংবা জেলা পরিষদ নির্বাচনের দাবি তুলবে কারা? জনগণ কার নেতৃত্বে এ দাবিতে সোচ্চার হবে? যারা চুক্তি করেছেন, জেলা পরিষদ আনার দাবি করছেন তারা তো এ নিয়ে আন্দোলন করেন না। যদি এ নিয়ে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের ঘোষণা দেন তাহলে জনগণ নিশ্চয় আন্দোলনে নামবে, সোচ্চার হবে- তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু নিজেরা হাত গুটিয়ে বসে থেকে ‘দাবি তুলুন’ বলে দায়িত্ব শেষ করলে কী জনগণ দাবি তুলবে বা আন্দোলনে নামবে?
যাই হোক, জেলা পরিষদগুলো যেভাবে চলছে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের ভোট ছাড়া অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে যুগ যুগ ধরে এভাবে এ পরিষদগুলো চলতে দেওয়া যায় না। এ পরিষদগুলোকে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে ফ্যাক্সে বা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দলীয় নেতাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে যথাযথ নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় এ পরিষদগুলো কখনো জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে না।
নিরন চাকমা
২১.০৮.২০২৬

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন