বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামেও কী নেপালের পরিণতি অপেক্ষা করছে?

গতকাল (২৬ আগস্ট) নেপালে তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক হতাহত ও ক্ষয়-ক্ষতির ঘটনায় বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৬২ জনের মৃত্যু ও পাঁচ শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যাচ্ছে। নিখোঁজদের মধ্যে নেপালের নাগরিক ছাড়াও ভারত, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া একই ঘটনায় তিব্বতেও হতাহত ও ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

এই ভয়াবহ দুর্যোগের কারণ হিসেবে প্রথমে ভূমিকম্প বলা হলেও পরে ঘটনা বিশ্লেষণ করে তা ভূমিধসের কারণে ঘটনাটি ঘটেছে বলে ভূ-তত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন। তবে প্রকৃত কারণ জানতে হয়তো আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

যেই কারণেই এমন বিপর্যয়কর ঘটনাটি ঘটুক না কেন এটা যে প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণের ফল তা অস্বীকার করার কোন জো নেই।

যে এলাকায় এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে তিব্বতের কৈলাস পর্বতের কাছে মানস সরোবর ও নেপালের রাসুয়া জেলার গোসাইকুণ্ড হ্রদ রয়েছে। প্রতিবছর সেখানে হাজার হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেন। বছরের এই সময়টিতে, বিশেষ করে ভারতীয় পর্যটকেরা মানস সরোবর ভ্রমণ এবং গোসাইকুণ্ডে পবিত্র স্নান করতে যান। (সূত্র: প্রথম আলো)।

প্রকৃতঅর্থে পর্যটন কিংবা উন্নয়নের নামে দেশে দেশে যেভাবে প্রকৃতিকে ধ্বংসসাধন করা হচ্ছে তার ফলই মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে। ‌‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ বলে যে কথাটি প্রচলিত রয়েছে তা আমরা নেপালের ঘটনাটিকে উদাহরণ হিসেবে নিতে পারি। প্রকৃতিকে যদি তার মতো থাকতে দেওয়া হয় তাহলে তাকে শান্ত ও দৃষ্টিনন্দনরূপেই আমরা দেখতে পাই। কিন্তু তার বিপরীতে যখন প্রকৃতির ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়, তার বিরুদ্ধাচরণ করা হয়, তখন সে তার রুদ্রমূ্র্তি নিয়ে হাজির হয়, যা নেপালে ঘটেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এ ধরনের বিপর্যয় ঘটতে আমরা দেখতে পেয়েছি। মূলত মুনাফাভিত্তিক উন্নয়নই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামেও কী এমন বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে?

আমরা জানি, পার্বত্য চট্টগ্রাম এক সময় ছিল গাছ-পালা, ঘন বন-জঙ্গলে আচ্ছাদিত একটি অঞ্চল। ছিল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় স্থল। মানুষের বসবাস ছিল অত্যন্ত কম। কিন্তু এখন মানুষের বসতি বেড়েছে, গাছ-পালা, বন-জঙ্গল উজাড় হয়েছে, বন্য পশু-পাখি, জীব-জন্তুর বিলুপ্তি ঘটেছে, অবাধ পর্যটন ও উন্নয়নের নামে, সড়ক নির্মাণের নামে পাহাড়ের পর পাহাড় কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। এর ফলে প্রকৃতিকে সঠিকরূপে টিকে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে।

২০১৭ সালে একবার আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। সেবার শুধু তিন পার্বত্য জেলায় অন্তত ১২০ জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির চিত্র আমরা দেখছি। অতি সম্প্রতি আকস্মিক বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হওয়ার চিত্র আমরা দেখতে পেয়েছি। এসব যা ঘটছে তা আগাম কোনো সতর্কবার্তা বলেই মনে হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন চলছে উন্নয়নের নামে প্রকৃতি-পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসব। দেশে যে সরকার ক্ষমতায় আসে সে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন ও পর্যটনের নামে প্রকৃতি-পরিবেশ ধ্বংসের খেলায় মেতে ওঠে। সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে তাতেই মনে হয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের একটা প্লট তৈরি হয়ে যাচ্ছে। কারণ সড়কটি নির্মাণ করতে গিয়ে যেভাবে শত শত পাহাড়, বন-জঙ্গল কেটে সাবাড় করা হচ্ছে- এটা প্রকৃতির সাথে যে কী ভয়াবহ অবিচার করা হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। এমন অবিচার প্রকৃতি কখনো সহ্য করতে পারবে বলে মনে হয় না।

আপাতদৃষ্টিতে সীমান্ত সড়কের দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হওয়া গেলেও তা যে ভবিষ্যতে কী পরিণতি বয়ে আনবে তা নিয়ে কারোর যেন কোনো ভাবনা নেই। দেশের পরিবেশবিদগণ, সচেতন ব্যক্তিবর্গ, বুদ্ধিজীবীরা এ নিয়ে একেবারেই নিশ্চুপ!

শুধু তাই নয়, বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন অঞ্চল হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম। প্রতিদিন শত শত পর্যটক পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি-পরিবেশ দিন দিন ভারসাম্য হারিয়ে বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কাজেই, সব মিলিয়ে যে কোনো সময় প্রকৃতির প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে পারে পাহাড়ের মানুষ। আর তাতে নেপালের চেয়েও যে ভয়াবহ বিপর্যয় বা পরিণতি ঘটবে না তা কী বলা যায়?

সুতরাং, পার্বত্যবাসীসহ দেশের জনগণকে নেপালের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ, মুনাফাভিত্তিক উন্নয়ন-পর্যটন কার্যক্রম পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। অন্যথায় ভবিষ্যত প্রাকৃতিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হবে না।

নিরন চাকমা

২৭.০৮.২০২৬

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন